খামারের মাছ-মুরগি আমাদের জন্য কতটা নিরাপদ?

লাল মাংসে চর্বির পরিমাণ বেশি। উচ্চ রক্তচাপ, এলার্জিসহ শারীরিক নানা জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে এ জন্য। তাই সাদা মাংস তথা মুরগির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। আর এ ক্ষেত্রে এগিয়ে ব্রয়লার। দ্রুত এক কেজি গরুর মাংস ৫০০ টাকার বিপরীতে ১৩০ টাকায় পাওয়া যায় একই পরিমাণ মাংস। বর্ধনশীল হওয়ায় ব্রয়লারের খামারের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি। তবে এই মুরগি আবার খুব বেশি সংবেদনশীল। সহজে বিস্তার ঘটে নানা রোগের। আর মড়ক একবার লাগলে শেষ হয়ে যেতে পারে গোটা খামার। এ জন্য সতর্ক থাকেন খামারিরাও। আর এই মাত্রাতিরিক্ত সতর্কতা আবার জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। তথ্য মিলছে, যেসব অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের জন্য ব্যবহারের, যেগুলো জরুরি না হলে ব্যবহার করার কথা নয়, সেগুলোও অবলীলায় ব্যবহার হচ্ছে। আবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর যতদিন মুরগি বাজারে আনার কথা না, তার আগেই বিক্রি করতে আনা হচ্ছে। মুরগিকে মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানোর ফলে মানুষের শরীরেও পড়ছে এর প্রভাব। গবেষণায় দেখা গেছে, মানব শরীরে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। আর বাংলাদেশের প্রথম চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের আইসিইউতে এমন রোগী পাওয়া গেছে যাদের ওষুধে কাজ করেনি। নতুন এই ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীবকে বলা হচ্ছে সুপারবাগ। আশঙ্কার কথা, যেসব কারণে এই সুপারবাগ ছড়ায়, তার মধ্যে একটি হলো প্রাণিজ আমিষে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি। আর এর মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি করেছে মুরগি। ঢাকার আশপাশে বেশ কয়েকটি ব্রয়লার মুরগির খামার পরিদর্শন করে দেখা যায়, প্রতিটি খামারেই মুরগি বড় করার জন্য ‘অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স’ রয়েছে। ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের পরদিন থেকে শুরু হয় এই কার্যক্রম। কিন্তু খামারিদের মধ্যে এ নিয়ে তেমন কোনো ধারণা নেই। কতটা ব্যবহার করা যাবে, কোনটি ব্যবহার করা যাবে, কোনটি ব্যবহারের কত দিন পর বাজারে আনতে হবে, সে বিষয়ে সতর্কতা নেই। খামারিরা জানান, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে তারা বাচ্চা কিনে আনেন। এক দিন বয়সি বাচ্চার শক্তি ধরে রাখতে তাদের দেওয়া হয় এনার্জি প্লাস স্লাইন, যা ২৪ ঘণ্টা খাওয়ানো হয়। এরপর দেওয়া হয় ‘রেনা সি’ নামের একটি ভিটামিন। প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া শুরু হয় চার দিন বয়সে। এটি মুরগির রোগ প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করে বলে জানান খামারিরা। তাদের মতে, এটি মূলত দেওয়া হয় মুরগির বাচ্চার নাভি শোকানোর জন্য। কেননা, নাভি না শুকালে বাচ্চা মরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এটি মানবস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ কি না সেই বিষয়টি কোনো দিন ভেবেই দেখেননি তারা। কারণ কেউ বিষয়টি নিয়ে তাদের জানায়নি। না ওষুধ বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান, না সরকারি প্রতিষ্ঠান। খামারিরা জানান, একদিন বয়সি বাচ্চা কিনে তা ৮০০-৯০০ গ্রাম ওজন হতে সময় লাগে প্রায় আড়াই মাস। এই সময়ের মধ্যে চারটি অ্যান্টিবায়োটিক ও প্রায় ৮-১০ ধরনের ভিটামিন খাওয়ানো হয়। পানি ও খাবারের পাশাপাশি বাচ্চার ১২ দিন বয়সে দ্বিতীয় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় প্রতিটি মুরগির বাচ্চাকে। এরপর ১৮ দিন বয়সে তৃতীয় ও ২২ দিন বয়সে চতুর্থ ও শেষ অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।

একাধিক খামারির দাবি, মুরগি জবাই করার ৭২ ঘণ্টা আগে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হলে তা মানবদেহের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। তবে এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে কি না সেটা জানা নেই কারও। কেরানীগঞ্জ উপজেলার আটিবাজার সুজন হাউজিং এলাকার অন্যতম পুরোনো পোলট্রি ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসা শিক্ষা বিভাগে স্নাতকোত্তর পাস করে খামার গড়ে তোলেন ২০০৯ সালে। দাবি, তার খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলেও তা পরিমিত। বলেন, ‘আমরা অ্যান্টিবায়োটিকের তুলনায় ভিটামিন বেশি ব্যবহার করছি, যা মুরগির স্বাস্থ্যের জন্য দরকারি।’ ‘আমাদের যেমন রোগ হয়, তেমন মুরগিরও হয়। তাই তাদেরকে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়। তবে মুরগি জবাই করার ৭২ ঘণ্টা আগে যদি অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া বন্ধ করা হয় তাহলে মানবদেহের জন্য কোনো সমস্যা হবে না। অনেক অসাধু ও অসচেতন ব্যবসায়ী আছে যারা এটার তোয়াক্কা করেন না, যা খুবই বিপজ্জনক। আমরা যারা এ ব্যবসায়ে আছি তাদের অবশ্যই মানুষকে নিরাপদ মুরগি সরবরাহ করতে হবে। আমাদের আরও সচেতন হতে হবে যেন সাধারণ মানুষ নিরাপদ মুরগি খেতে পারে।’ আফজালের কথায় এটা স্পষ্ট যে, যে যার মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছেন। বিশেষজ্ঞরা এমনও জানাচ্ছেন, যেগুলো মানুষের জন্য তৈরি, সেই ওষুধ বেআইনিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মুরগির জন্য। আর এই ওষুধ কেনাবেচায় কোনো নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই যার মতো করে অবাধে কিনে আনা সম্ভব দোকান থেকে। আফজালের খামারটির পরিচর্যাকারী শরিফ হোসেন জানান, ব্রয়লার মুরগিকে একদিন বয়স থেকে ২০-২৫ দিন বয়স পর্যন্ত যে খাবার দেওয়া হয় তার নাম স্ট্রাটার। এটি শেষ করে মুরগি বিক্রির আগ পর্যন্ত খাওয়ানো হয় গ্রোয়ার নামের এরো একটি খাবার। যার পাশাপাশি খাওয়ানো হচ্ছে চার থেকে ছয় ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ও ১০ থেকে ১২ ধরনের ভিটামিন। শরিফ জানান, ৪-৫ দিন বয়সে ও ১৮-২২ দিন বয়সে মুরগিকে যে অ্যান্টিবায়োটিক ও ভিটামিন খাওয়ানো হয় তা মুরগির ওজন বাড়তে সাহায্য করে। ২২ দিন বয়সে মুরগিকে দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিক মুরগির ওজন বৃদ্ধি করে। কথাটি স্বীকার করেছেন খামারটির মালিক আফজাল হোসেনও। জানান, বাংলাদেশ থেকে ব্রয়লার মুরগি রপ্তানির সুযোগ খুব কম। কারণ সরকার পোলট্রি খাতে তেমন কোনো সহায়তা দিচ্ছে না। ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ দিতে আগ্রহী না। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করে পোলট্রি খামার পরিচালনার ঝুঁকি নিতে রাজি নন এসব ব্যবসায়ী।‘দেশের বাইরে খামারগুলোতে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করার নিয়ম নেই। এটা আমরাও জানি। কিন্তু আমরা সে নিয়ম মানতে পারছি না। কারণ দেশের বাইরে ওইসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকির দিকটা তাদের সরকার বিবেচনা করে। কিন্তু আমাদের এখানে সেটা করা হচ্ছে না। সরকার আমাদের সহযোগিতা করলে, আমাদের ঝুঁকি নিলে আমরাও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করে খামার করতে পারি’- বলেন এই ব্যবসায়ী।

পশুর খাবারেও বিষ বিপত্তি আরো আছে। অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়ালে মুরগি বড় হবে না। এমন বিশ্বাস অধিকাংশ খামার ব্যবসায়ীর। অভিযোগ আছে, মুরগিকে দ্রুত বড় করার জন্য ব্রয়লার মুরগিকে খাওয়ানো হয় ট্যানারিতে তৈরি করা গরুর চামড়ার উচ্ছিষ্ট অংশ। ১২-১৪ ধরনের রাসায়নিক মিশ্রিত এই উচ্ছিষ্ট মুরগির ভিটামিন হিসেবে চেনেন খামারিরা। আর এর ফলে মুরগির মাংস হয়ে পড়ছে বিষাক্ত। রাজধানীর হাজারীবাগ ট্যানারি এলাকায় এই খাবার উৎপাদন হতো। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সেখান থেকে স্থানান্তর হয়েছে চামড়া দিয়ে পোলট্রি ফিড তৈরির কারখানাগুলোও। বর্তমানে কারখানাগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সাভারের হেমায়েতপুরে। হাজারীবাগে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গরুর চামড়ার উপরের উচ্ছিষ্ট অংশ কেটে তুলে তা রোদে শুকানো হতো। দূর-দূরান্ত থেকে পোলট্রি খামার তৈরির কারখানা থেকে লোকজন এসে এসব নিয়ে যেতেন বলে জানান হাজারীবাগের বাসিন্দা শরিফ প্রামাণিক। হাজারীবাগ থেকে কারখানা সরার পর সাভারে যে অবাধে এই অপকর্ম চলছে, সেটা র‌্যাবের ভেজালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানেই স্পষ্ট। গত ২৭ এপ্রিল সাভারের আমিন বাজারের একটি পোলট্রি ফিড কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৪২০ টন পোলট্রি খাবার জব্দ হয়। ট্যানারির ফেলে দেয়া বর্জ্য থেকে এসব খাদ্য তৈরি করা হচ্ছিল। র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায় কারখানা মালিক ও কর্মচারীরা। গত ২২ জানুয়ারির অভিযানটি ছিল আরো বড়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং র‌্যাব-৪ এর যৌথ উদ্যোগে ভাকুর্তা ইউনিয়নের মোগড়াকান্দা গ্রামে এই অভিযানে জব্দ জয় ১১ হাজার টন পোলট্রি খাবার। ঢাকা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ইমদাদুল হক তালুকদার বলেন, এ ধরনের বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য দিয়ে এখানে মাছ এবং মুরগির জন্য যে খাবার তৈরি করা হচ্ছিল তা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসব মাছ এবং মুরগিতে যে পরিমাণ ক্রোমিয়াম রয়েছে তার ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়ও নষ্ট হয় না। সেখানে খাবার রান্না হয় ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এর মাধ্যমে ক্রোমিয়াম মানবদেহে প্রবেশ করে লিভার, লাঞ্চ, কিডনি এবং মস্তিষ্কের সমস্যা হবে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারাবে। এ রকম অভিযান প্রায়ই হচ্ছে। তবে কত হাজার টন খাবার মাছ ও মুরগির খামারে এরই মধ্যে চলে গেছে, সে হিসাব করার সুযোগ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *